প্রশাসনিক দপ্তরে প্রবাসীর চরম বিড়ম্বনা ও লাঞ্ছনা
কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রবাসীরা নিজ দেশে ফিরেও কতটা হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হন, তার এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটল সিলেটে। পর্তুগাল থেকে দেশে ফিরে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করতে গিয়ে সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে চরম হেনস্থা ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন এক প্রবাসী যুবক। সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এই প্রবাসীকে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্য সেবা প্রার্থীদের সামনেই দুই গালে চড় মারার চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীনের বিরুদ্ধে।
দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সঙ্গে একজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তার এমন আচরণ ও অসৌজন্যমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো সিলেট বিভাগজুড়ে তীব্র ক্ষোভের দাবানল জ্বলছে। সাধারণ সেবা প্রার্থী এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঘটনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
ঘটনার স্থান, কারণ ও ভুক্তভোগী প্রবাসীর বিবরণ
ঘটনার বিবরণ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী প্রবাসী দীর্ঘদিন পর্তুগালে অবস্থান করার পর সম্প্রতি নিজ জন্মভূমি সিলেটে আগমন করেন। দেশে ফেরার পর তিনি নিজ এলাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও নাম সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন। পাসপোর্ট ও অন্যান্য অফিশিয়াল কাজের সুবিধার্থে তিনি এনআইডি সংশোধন করা জরুরি মনে করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পর্তুগাল থাকার প্রমানক এবং পাসপোর্টের ফটোকপি সংগ্রহ করেন।
পরবর্তীতে তিনি সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে উপস্থিত হন এনআইডির সমস্যা সমাধানের আশায়। ভুক্তভোগী প্রবাসীর লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সব বৈধ কাগজপত্র নিয়ে কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তার ফাইলটি আটকে রাখা হয় এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক অজুহাত দেখিয়ে তাকে হয়রানি করা হতে থাকে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও সমাধান না পাওয়ায় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীনের কক্ষে যান এবং বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রবাস জীবন ও জরুরী পরিস্থিতির বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন।
কথা কাটাকাটি এবং জনসমক্ষে চড় মারার পৈশাচিক অভিযোগ
ভুক্তভোগী প্রবাসীর ভাষ্যমতে, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো কড়া ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ফাইল ও কাগজপত্র নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে কর্মকর্তা আলাউদ্দীন নিজ আসন থেকে উঠে এসে চরম উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
তিনি সব ধরনের সৌজন্যতার সীমা লঙ্ঘন করে অফিস কক্ষের ভেতরেই সকলের সামনে ওই প্রবাসীকে চরমভাবে অপমান করেন এবং তার ওপর চড়াও হন। ভুক্তভোগী প্রবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং সরাসরি তার দুই গালে কষে চড় মারেন। একজন সরকারি দপ্তরের প্রধানের কাছ থেকে এমন অমানবিক ও বলপ্রয়োগের শিকার হয়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন ওই প্রবাসী যুবক।
নির্বাচন অফিসে উপস্থিত সেবা প্রার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভ
ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওই সময় নির্বাচন কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা একাধিক সাধারণ মানুষ জানান, চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তারা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কক্ষের দিকে যান। একজন সাধারণ সেবা প্রার্থী, তাও আবার একজন প্রবাসী নাগরিকের ওপর সরকারি কর্মকর্তার হাত তোলার ঘটনায় অফিসে উপস্থিত স্থানীয় সেবা প্রার্থীদের মাঝে তাৎক্ষণিক তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীর স্বজনরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান এবং নির্বাচন কার্যালয়ে কিছু সময়ের জন্য তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে রক্ত পানি করা টাকা পাঠিয়ে দেশকে বাঁচিয়ে রাখছেন, আর নিজ দেশের সরকারি দপ্তরে এসে তাদের ওপর এভাবে চড়াও হওয়া অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীনের বক্তব্য ও সাফাই
ঘটনার বিষয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে অভিযুক্ত সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন সরাসরি চড় মারার কথা অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। তবে তিনি প্রবাসীর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেননি।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি একে সামান্য ‘ভুল বোঝাবুঝি ও তপ্ত বাক্যবিনিময়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, প্রবাসীর আবেদন প্রক্রিয়াটিতে কিছু কারিগরি ও আইনি ত্রুটি ছিল, যা তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তার দাবি, বিষয়টি পরবর্তীতে উপস্থিত অন্যদের মধ্যস্থতায় সমাধান করা হয়েছে এবং প্রবাসীকে এনআইডি সংশোধনের জন্য নতুন করে আবেদনের সঠিক নিয়মাবলি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কর্মকর্তা চড় মারার বিষয়টিকে আড়াল করতে চাইলেও প্রবাসীর আনীত অভিযোগ নিয়ে সিলেটে তোলপাড় থামছে না।
প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
সেবা নিতে গিয়ে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীর ওপর এমন চড়াও হওয়া ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি সিলেটের প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, প্রবাসী কল্যাণ সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
অধিকার কর্মীরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা বা হাত তোলা সম্পূর্ণ বেআইনি ও ফৌজদারি অপরাধের শামিল। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক ও স্পর্শকাতর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি বিষয়টি কেবল ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়ে থাকে, তবে একজন কর্মকর্তা কীভাবে উত্তেজিত হয়ে নাগরিককে লাঞ্ছিত করার সাহস পান—সেই প্রশ্ন তুলছেন সকলে
প্রবাসীদের সম্মান রক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্তের আকুতি
প্রবাসীরা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যারা দেশের চাকা সচল রাখেন, তারা সরকারি দপ্তরগুলোতে গিয়ে এভাবে লাঞ্ছিত হলে বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সিলেটের জকিগঞ্জের এই প্রবাসীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এনআইডি সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষী কর্মকর্তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সিলেটবাসী।
