![]() |
| ছবি: বেঙ্গল প্রেস |
বিশেষ প্রতিনিধি, গোলাপগঞ্জ | প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
রক্ষক যখন ভক্ষক: সিলেটে তুলকালাম কাণ্ড
সিলেটের গোলাপগঞ্জে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে হাতেনাতে এক পুলিশ কনস্টেবলকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা। জননিরাপত্তা রক্ষা ও অপরাধ দমনের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি চুরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি পুরো সিলেট জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও তোলপাড়ের সৃষ্টি করেছে।
আটককৃত ওই পুলিশ সদস্যের নাম মুরসালিন। শনিবার (২৯ আগস্ট) গোলাপগঞ্জ থানা এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ তাকে মোটরসাইকেল চুরির চেষ্টা অথবা জড়িত থাকার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলে। পরবর্তীতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তাকে গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার স্থান ও জনতার হাতে আটকের বিবরণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গোলাপগঞ্জের একটি জনবহুল এলাকায় পার্ক করে রাখা একটি মোটরসাইকেল চুরি বা সন্দেহজনকভাবে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন কনস্টেবল মুরসালিন। তার গতিবিধি ও আচার-আচরণে সন্দেহ হলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও পথচারীরা তাকে ঘিরে ফেলেন।
উপস্থিত জনতা তাকে জেরা শুরু করলে তিনি প্রথমে নিজের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন কর্মরত কনস্টেবল হিসেবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য হন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হন। সাধারণ মানুষ তাকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন। ঘটনার পর এলাকা জুড়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও ক্ষোভ প্রকাশ পেতে থাকে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা
ঘটনার বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশের একটি বিশেষ ও চৌকস দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল ও জনতার হাতে আটক কনস্টেবল মুরসালিনের কাছে পৌঁছায়। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে আটক কনস্টেবলকে উদ্ধার করে নিরাপদে থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়।
পুলিশের উপস্থিতি দেখে উত্তেজিত জনতা কিছুটা শান্ত হলেও তারা অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। গোলাপগঞ্জ থানা প্রাঙ্গণেও সংবাদকর্মী ও স্থানীয় উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। চুরির মতো অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ সংগ্রহে নামেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গোলাপগঞ্জ থানা ও ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের বক্তব্য
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, চুরির অভিযোগে স্থানীয় জনতা মুরসালিন নামে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে আটক করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। তিনি পুলিশের সদস্য হলেও আইন সবার জন্য সমান। অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে সাধারণ অপরাধীর মতোই কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কনস্টেবল মুরসালিনের বিরুদ্ধে চুরি ও ফৌজদারি অপরাধের মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড)সহ কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও জনমনে তীব্র ক্ষোভ
সিলেটের গোলাপগঞ্জের এই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত যার দায়িত্ব, সেই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ওঠায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সামান্য ব্যক্তিগত স্বার্থে বা অপরাধপ্রবণ মানসিকতার কারণে একজন পুলিশ সদস্যের এই কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সহকর্মী হওয়ার সুবাদে তাকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক বা পেশাগত পরিচয় নেই
গোলাপগঞ্জে পুলিশের হাতে নিজস্ব সদস্যের আটকের এই ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করে যে, অপরাধীর কোনো নির্দিষ্ট স্থান, পদবী বা পরিচয় থাকে না। একজন চোর বা অপরাধী কেবলই একজন অপরাধী। সিলেটবাসী ও গোলাপগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ এখন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন—আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের সদস্যের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন নজির স্থাপন করবে।
