![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
বিশেষ প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার | প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
প্রতিহিংসার আগুনে বিসর্জন নিজের জন্ম দেওয়া সন্তান
প্রতিবেশীকে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার অন্ধ নেশায় নিজের সাড়ে তিন বছরের অবোধ ঘুমন্ত রক্তকে নির্মমভাবে হত্যা করা ঘাতক বাবা শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ফাঁসির আদেশের পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, নজিরবিহীন ও রোমহর্ষক এই হত্যা মামলার রায় অবশেষে ঘোষিত হলো, যা শুনে পুরো মৌলভীবাজারজুড়ে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক মো. আনোয়ারুল হক জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। জন্মদাতা বাবার এমন পাষণ্ড ও পৈশাচিক আচরণের দায়ে চরমতম শাস্তির এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ ও আইনি মহল।
ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ ও পৈশাচিক পরিকল্পনা
মামলার এজাহার, বিবরণী ও পুলিশ তদন্ত সূত্রে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টার দিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভানুবিল গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল। পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিবেশী সালেক মিয়াকে যেকোনো মূল্যে একটি হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে আজীবন জেলে পচানোর পরিকল্পনা করে স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ আলী।
প্রতিবেশীকে শিক্ষা দেওয়ার সেই কুৎসিত ও জঘন্য প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে নিজের রক্তের টান, নৈতিকতা ও বাবার চিরন্তন স্নেহের কথা বিন্দুমাত্র ভাবেননি শরীফ আলী। গভীর রাতে নিজ বসতঘরে মায়ের পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সাড়ে তিন বছরের ফুটফুটে শিশুকন্যা রুনা বেগমকে লক্ষ্য করে সে। নিজের হাত দিয়ে ধারালো দা উঁচিয়ে অবোধ রুনার গলায় কোপ বসিয়ে দেয় জন্মদাতা বাবা নিজেই। রক্তে ভেসে যায় বিছানা, নিভে যায় একটি ছোট্ট নিষ্পাপ জীবন।
মিথ্যা সাজানো ঘটনা ও পুলিশের তদন্তে সত্য প্রকাশ
শিশুকন্যা রুনাকে কুপিয়ে হত্যার পরপরই ঘাতক শরীফ আলী এলাকায় চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এবং প্রতিবেশী সালেক মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ঘরে ঢুকে তার মেয়েকে হত্যা করেছে বলে নাটক সাজায়। কিন্তু একটি অবোধ শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং পরিবারের ভেতরের অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তায় প্রাথমিকভাবেই পুলিশের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়।
ঘটনার পর নিহত শিশু রুনার মা এবং আসামির স্ত্রী নেকজান বিবি বাদী হয়ে কমলগঞ্জ থানায় একটি অজ্ঞাত ও অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর কমলগঞ্জ থানা পুলিশ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে তদন্ত কাজ শুরু করে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর দেখতে পান যে বাইরের কোনো লোকের পক্ষে ঘরে ঢুকে এভাবে সরাসরি শিশুকে হত্যা করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
আদালতে ১৬৪ ধারায় ঘাতক বাবার স্বীকারোক্তি
পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের কাছে একপর্যায়ে ভেঙে পড়ে পাষণ্ড বাবা শরীফ আলী। নিজের তৈরি করা মিথ্যার জাল ভেঙে সে স্বীকার করে যে, প্রতিবেশীকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যই সে নিজের মেয়েকে বলি চড়িয়েছে। পরবর্তীতে ঘাতক শরীফ আলীকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে সে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।
জবানবন্দিতে শরীফ আলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে যে, কীভাবে সে গভীর রাতে দা ধার দিয়েছিল, কীভাবে ঘুমন্ত মেয়ের গলায় কোপ মেরেছিল এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশীকে ফাসাতে পুরো নাটকটি কীভাবে সাজিয়েছিল। তার এই জবানবন্দি শুনে তৎকালীন বিচারক ও তদন্তকারী কর্মকর্তারাও শিউরে উঠেছিলেন।
দীর্ঘ ১২ বছরের আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যপ্রমাণ
২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মামলার বিচারকাজ ছিল অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী। পুলিশ তদন্ত শেষে শরীফ আলীকে একমাত্র মূল অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিচার বিভাগ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করে।
আদালত রাষ্ট্রপক্ষের বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন, চিকিৎসকের দেওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন এবং পুলিশের দেওয়া আলামত ও আসামির নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ বিন্দুমাত্র সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে, শরীফ আলী নিজেই নিজের সন্তানকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে।
আদালতের ঐতিহাসিক রায় ও জনমনে স্বস্তি
সোমবারে বিচারক মো. আনোয়ারুল হক রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামি শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ) এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রায়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, নিজের সন্তানকে হত্যা করে অন্যকে ফাঁসানোর মতো নিকৃষ্ট মানসিকতার অপরাধীদের জন্য এই রায় একটি বড় সতর্কবার্তা। সমাজ থেকে এমন বিকৃত অপরাধ দমনে কঠোর শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক শিক্ষা
রায়ের খবর কমলগঞ্জের পূর্ব ভানুবিল গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহতের মা নেকজান বিবি ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, নিজের সন্তানকে যে বাবা এভাবে কেটে ফেলে, সে মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। ১২ বছর পর হলেও রুনা হত্যার সঠিক বিচার হয়েছে।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রামগঞ্জে শত্রুতা বা প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে নিজের স্বজনদের আঘাত করা বা মিথ্যা মামলা দেওয়ার প্রবণতা মাঝে মাঝে দেখা যায়। কিন্তু মৌলভীবাজারের এই পৈশাচিক ঘটনাটি প্রমান করে যে, মিথ্যা ও প্রতিহিংসার জয় কখনো হয় না। আইন ও সত্যের কাছে অপরাধীকে নতি স্বীকার করতেই হয়। ১২ বছর আগের সেই আড়াই বছরের অবোধ শিশু রুনার আত্মা আজ হয়তো এই রায়ের মাধ্যমে একটু শান্ত হলো।
