বিয়ের ফাঁদে চীনা স্বপ্ন: ৪ হাজারেরও বেশি নারী পাচারের শিকার, প্রকাশ্যে ভয়ঙ্কর প্রতারণার তথ্য

Bengal Press
0
ছবি: সংগৃহীত 


বিশেষ প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক ডেস্ক| প্রকাশ: ২৩ আগস্ট, ২০২৬

সুখী দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন, উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশা কিংবা পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আকুল আকুতি— এসব আবেগ ও দুর্বলতাকে পুঁজি করেই ডালপালা মেলছে এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচার করার মতো এক ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদ তৈরি হয়েছে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়ে শেষ পর্যন্ত অনেক নারীর জীবন পরিণত হয়েছে অভিশপ্ত নরকে।

​সাম্প্রতিক এক কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পারিবারিক বা Q1 (ফ্যামিলি ভিজিট) ভিসায় অন্তত ৪,২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে গিয়েছেন। বিয়ের নামে নারীদের পাচারের এই ভয়াবহ অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এই পরিসংখ্যান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও তোলপাড়।

​পরিসংখ্যানের ভয়াবহ লাফ: ২০২০ থেকে ২০২৫

​সরকারি ও বেসরকারি পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে বিশেষ এক ক্যাটাগরির ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের চীন গমনের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র ফুটে ওঠে:

​২০২০ সাল: প্রাথমিক অবস্থায় ২০২০ সালে মাত্র ৬৯ জন বাংলাদেশি নারী Q1 ভিসায় চীনে যান।

​২০২১ সাল: এই বছর সংখ্যাটি কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৭ জনে।

​২০২২ সাল: করোনা মহামারী ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে ২০২২ সালেও এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ জন।

​তবে আসল পরিবর্তনের খেলা শুরু হয় ২০২৩ সাল থেকে। বিধিনিষেধ শিথিল হতে না হতেই ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে পাচারচক্রগুলো হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে।

​২০২৩ সাল: হঠাৎ করেই এক লাফে এই সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ১,০১৬ জনে।

​২০২৪ সাল: চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং ১,৩৭৮ জন নারী চীনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।

​২০২৫ সাল: পরিসংখ্যানের সব রেকর্ড ভেঙে এই সংখ্যা পৌঁছায় ১,৭২১ জনে।

​সংবাদ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যে সংখ্যাটি কয়েক শ’র নিচে ছিল, তা ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। মূলত ভুয়া বিয়ে ও জাল কাগজপত্রের আড়ালে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রগুলো এই সুযোগকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছে।

​কাজের কৌশল: লক্ষ্যবস্তু যখন প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নারী

​তদন্তে উঠে এসেছে, এই সংঘবদ্ধ পাচারচক্রটি খুবই পরিকল্পিতভাবে তাদের শিকার বেছে নেয়। মূলত দেশের সুবিধা-বঞ্চিত, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, পাহাড়ি অঞ্চলের নিস্তব্ধ এলাকায় বসবাসকারী এবং নানাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা তরুণী ও নারীদের তারা মূল টার্গেট বানায়।

ছবি: সংগৃহীত 


​প্রথমে ঘটক বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে সহজ-সরল পরিবারগুলোকে বিশাল অঙ্কের টাকা, চীনা স্বামীর কোটিপতি হওয়ার কাল্পনিক গল্প এবং পরিবারকে সচ্ছল করে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। বিয়ের যাবতীয় খরচ চীনা নাগরিক বা তাদের এজেন্টরা বহন করার প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অর্থনৈতিক দুর্দশার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে একপ্রকার রাজি করানো হয়। কিন্তু বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চীনে নিয়ে যাওয়ার পরই উন্মোচিত হয় তাদের আসল এবং নির্মম চেহারা।

​প্রলোভন, ব্ল্যাকমেইল ও শারীরিক নির্যাতন: ভুক্তভোগীদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

​পাচারের এই প্রক্রিয়ায় কেবল বিয়ের মিথ্যে প্রলোভনই শেষ কথা নয়; নারীদের জালে ফেলতে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা অপরাধমূলক ও জোরজবরদস্তিমূলক পদ্ধতি। সম্প্রতি বাগেরহাট, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো জেলাগুলো থেকে আসা একাধিক লোমহর্ষক অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হতবাক করে দিয়েছে।

​বাগেরহাটের ১৯ বছর বয়সী তরুণীর ঘটনা:

সম্প্রতি বাগেরহাটের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী আন্তর্জাতিক মানবপাচার বিরোধী একটি সংগঠনের সহায়তায় গত ৪ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি যে অভিযোগ করেছেন, তা অত্যন্ত শিহরিত করার মতো।

​ঐ তরুণী জানান, তাকে প্রথমে কৌশলে চেতনা নাশক ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়। এরপর তার কিছু আপত্তিকর ও সংবেদনশীল ছবি এবং ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া বা পরিবারকে জানানোর ভয় দেখিয়ে তাকে অনবরত ব্ল্যাকমেইল করা হতে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য করে তাকে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

​বিয়ের পর তাকে চীনে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং প্রতিনিয়ত ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পাচার বিরোধী সংগঠনের নিরলস প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

​পাহাড়ি অঞ্চলে সক্রিয় চক্র:

একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে দেশের পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকেও। তথাকথিত উন্নত জীবনের প্রলোভন ও জোরপূর্বক চীনা নাগরিকদের সাথে পাহাড়ি নারীদের বিয়ে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে না জানিয়ে বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এসব বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা ও মামলা দায়ের করা হয়েছে।

​কঠোর হচ্ছে বিবাহের নিয়মাবলী: সরকারের নতুন প্রস্তাবনা

​বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ে এবং তা ব্যবহার করে নারী পাচার রোধে বাংলাদেশ সরকার এখন অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ভুয়া বিয়ে বন্ধে বিয়ের আইনি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে।

​প্রস্তাবিত নতুন নিয়মসমূহ:

১. বৈধ ভিসা ও পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক: কোনো বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবশ্যই বৈধ পাসপোর্ট ও উপযুক্ত ক্যাটাগরির ভিসা নিয়ে অবস্থান করতে হবে।

২. অন-অ্যারাইভাল ভিসায় বিয়ে নয়: অন-অ্যারাইভাল (On-arrival) ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত কোনো বিদেশি নাগরিকের পক্ষে বাংলাদেশে বিয়ে সম্পন্ন করার সুযোগ আর রাখা হচ্ছে না।

৩. অবিবাহিত সনদের সত্যানয়ন: বিয়ের আগে বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি যে 'অবিবাহিত' (Single Certificate)—তার প্রামাণ্য সনদ সংগ্রহ করতে হবে।

৪. দূতাবাস ও হাইকমিশনের সত্যায়ন: সেই অবিবাহিত সনদটি বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে সরকারিভাবে সত্যায়িত করতে হবে।

৫. নিবন্ধিত কাজী বা রেজিস্ট্রার: সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আইনগতভাবে স্বচ্ছ রাখতে নিবন্ধিত কাজী বা নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রি কর্মকর্তার উপস্থিতি ও রেজিস্ট্রেশন ব্যতিরেকে এই বিয়ে বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।

​আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আশা, এই কঠোর নিয়মগুলো কার্যকর হলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় এসে নারীদের বিয়ে করে পাচার করার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

​চীনা দূতাবাসের সতর্কতা ও সাধারণ মানুষের করণীয়

​বিষয়টির গুরুত্ব ও ভয়াবহতা অনুধাবন করে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস থেকেও অবৈধ ঘটক ও ম্যারেজ ব্রোকার চক্র নিয়ে সর্বসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে বিয়ে করার বিষয়ে তারা কঠোর বার্তা দিয়েছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়, তবে না জেনে, না বুঝে এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া হুট করে কোনো বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।

​তাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে:

​বিদেশি নাগরিকের পরিচয়, পাসপোর্ট ও ভিসার স্থায়িত্ব ভালোভাবে যাচাই করুন।

​দূতাবাস থেকে সত্যায়িত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে কি না তা নিশ্চিত হোন।

​কোনো মধ্যস্থতাকারী বা ঘটককে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করা থেকে বিরত থাকুন।

​যেকোনো সন্দেহজনক বিয়ের প্রস্তাবে স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করুন।

​একটু অসচেতনতা বা প্রলোভনে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোনো নারীর জীবনকে চিরতরে ঠেলে দিতে পারে এক অভিশপ্ত নরকে। তাই সামাজিক প্রতিরোধ এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে নারীদের এই ভয়াবহ মানবপাচার চক্রের হাত থেকে রক্ষা করতে।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

নতুন মন্তব্যগুলি মঞ্জুরিপ্রাপ্ত নয়৷*

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top