যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের চাকরি পেলেই সরকারকে দিতে হবে ১০ হাজার পাউন্ড! সরকারের নতুন নিয়মে দেশজুড়ে তোলপাড়

বেঙ্গল প্রেস
0



ডেস্ক নিউজঃ

​নতুন জীবনে পা রাখার আগেই বিশাল ঋণের বোঝা! যুদ্ধ, নির্যাতন বা দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ব্রিটেনে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে আসা মানুষদের জন্য এবার এক অভাবনীয় নিয়মের কথা ঘোষণা করল ব্রিটেনের হোম অফিস (Home Office)। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আশ্রয়প্রার্থী (Asylum seeker) ব্রিটেনে আইনিভাবে থাকার অধিকার এবং চাকরি পাওয়ার পর তাকে ব্রিটিশ সরকারকে প্রায় ১০,০০০ পাউন্ড (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার সমান) ফেরত দিতে হবে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ মূলত তাদের থাকা-খাওয়ার খরচ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এই পদক্ষেপকে 'অমানবিক' এবং 'শরণার্থীদের ওপর নতুন কর' বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

কী রয়েছে এই নতুন আইনে?

​ব্রিটেনের বর্তমান লেবার সরকারের (Labour Government) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Home Secretary) শাবানা মাহমুদ সম্প্রতি এই নতুন নিয়মের কথা ঘোষণা করেছেন। গত ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করা 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল' (Immigration and Asylum Bill)-এর আওতায় আনা এই নতুন নীতিতে বলা হয়েছে যে, সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের যে বাসস্থান এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, তারা রোজগার শুরু করার পর তা ধাপে ধাপে সরকারকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

​এই প্রক্রিয়াটিকে অনেকটা 'স্টুডেন্ট লোন' বা শিক্ষাঋণের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, একজন শরণার্থী যখন কাজ পাবেন এবং তার আয় একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করবে, তখন তার বেতনের একটি অংশ কেটে নেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ১০,০০০ পাউন্ড সম্পূর্ণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোনো শরণার্থী ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার বা 'সেটেলড স্ট্যাটাস' (Indefinite Leave to Remain) পাবেন না।

​এমনকি যদি কোনো ব্যক্তির আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হয় এবং তিনি নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন, তাহলেও ভবিষ্যতে কোনোদিন ব্রিটেনে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে এই বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল ব্রিটিশ সরকার?

​ব্রিটিশ সরকারের দাবি, বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীদের পেছনে করদাতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। গত বছর আশ্রয়প্রার্থীদের বাসস্থান এবং অন্যান্য সুবিধার পেছনে সরকারের প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একজন আশ্রয়প্রার্থীকে সাধারণ সরকারি বাসস্থানে রাখার জন্য প্রতিদিন ২৩.২৫ পাউন্ড এবং হোটেলে রাখার জন্য প্রায় ১৪৪ পাউন্ড খরচ হয়। এর পাশাপাশি জীবনধারণের জন্য জনপ্রতি সপ্তাহে ৯.৯৫ পাউন্ড থেকে ৪৯.১৮ পাউন্ড পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

​স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই নীতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, "আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করা সরকারের দায়িত্ব এবং তাদের অধিকার। কিন্তু এর পাশাপাশি তাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যখন তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবেন এবং উপার্জন করতে শুরু করবেন, তখন ব্রিটিশ জনগণের মহানুভবতার প্রতিদান দেওয়া তাদের কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।" সরকার মনে করছে, এই বিলটি বেআইনি অভিবাসন রোধ করতে এবং একটি 'কঠোর কিন্তু ন্যায্য' ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

সমালোচনার ঝড় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ক্ষোভ

​সরকারের এই ঘোষণায় রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং শরণার্থী সহায়তা গোষ্ঠীগুলো। রিফিউজি কাউন্সিল (Refugee Council)-এর এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর ইমরান হুসেন এই নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, "হোম অফিস নিজেই আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালীন কাজ করতে নিষেধ করে। অর্থাৎ, সরকারই তাদের বেকার বসে থাকতে বাধ্য করে। আর এখন তারা কাজ পেলে তাদের ওপর এই বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা যুদ্ধ বা নির্যাতন থেকে পালিয়ে একেবারে শূন্য হাতে এই দেশে এসে পৌঁছায়, তাদের জীবনের শুরুতে এমন ঋণ চাপানো সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং অবাস্তব।"

​হেলেন ব্যাম্বার ফাউন্ডেশনের আবাসন ও কল্যাণ ব্যবস্থাপক জো ডেক্সটার এটিকে সরকারের 'নিষ্ঠুরতার প্রদর্শন' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারের এই পরিকল্পনার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই এবং এটি মূল সমস্যা সমাধানের বদলে কেবল চমক সৃষ্টির চেষ্টা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? এটি কি আদৌ কার্যকর হবে?

​অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মাইগ্রেশন অবজারভেটরি' (Migration Observatory)-এর পরিচালক ড. মেডেলিন সাম্পশন এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, ব্রিটেনে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পাঁচ বছর পরও মাত্র ১৩% মানুষের আয় বছরে ২০,০০০ পাউন্ডের বেশি হয়। বাকিরা হয় খুব কম বেতনের কাজ করেন অথবা বেকার থাকেন।

​ড. সাম্পশন বলেন, "যেহেতু এটি একটি অত্যন্ত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, তাই এই প্রকল্প থেকে সরকারি কোষাগারে খুব বেশি অর্থ জমা পড়ার সম্ভাবনা নেই। বরং, এই নিয়ম তাদের কাজ খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে।" তাঁর মতে, আয়ের ওপর এমন কর বসানো হলে অনেকেই আনুষ্ঠানিক পথে কাজ করতে চাইবেন না, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া কেউ কেউ সরকারি খরচের বাসস্থান এড়িয়ে অন্য কোথাও থাকার চেষ্টা করতে পারেন, যা তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াবে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যৎ

​লেবার সরকারের ওপর অভিবাসন ব্যয় কমানোর ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে অভিবাসন খাতে সরকারের ব্যয় অন্তত ১ বিলিয়ন পাউন্ড কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে, দলের ভেতরের এবং বাইরের প্রবল বিরোধিতার মুখে এই বিলটি শেষ পর্যন্ত কতটা অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস হতে পারবে, তা নিয়ে জোর সন্দেহ রয়েছে।

​পরিশেষে বলা যায়, উন্নত জীবনের আশায় যারা সমস্ত বাধা পেরিয়ে ব্রিটেনে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের জন্য এই নতুন নিয়ম এক অশনিসংকেত। নতুন পরিবেশে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার আগেই মাথার ওপর ১০ হাজার পাউন্ডের ঋণের খাঁড়া তাদের স্বপ্নকে বড়সড় ধাক্কা দেবে। এখন দেখার বিষয়, বিতর্কের মুখে সরকার তাদের এই সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, নাকি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে নিয়মে কোনো পরিবর্তন আনে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top